37 C
Dhaka
শুক্রবার, মে ২৪, ২০২৪

ছেলেধরা – শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সেবার দেশময় রটে গেল যে, তিনটি শিশু বলি না দিলে রূপনারায়ণের উপর রেলের পুল কিছুতেই বাঁধা যাচ্ছে না। দু’টি ছেলেকে জ্যান্ত থামের নীচে পোঁতা হয়ে গেছে, বাকী শুধু একটি। একটি সংগ্রহ হলেই পুল তৈরী হয়ে যায়। শোনা গেল, রেল-কোম্পানির নিযুক্ত ছেলেধরারা শহরে ও গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্চে। তারা কখন এবং কোথায় এসে হাজির হবে, কেউ বলতে পারে না। তাদের কারও পোশাক ভিখিরীর, কারও বা সাধু-সন্ন্যাসীর, কেউ বা বেড়ায় লাঠিহাতে ডাকাতের মত—এ জনশ্রুতি পুরানো, সুতরাং কাছাকাছি পল্লীবাসীর ভয়ের ও সন্দেহের সীমা রহিল না যে এবার হয়ত তাদের পালা, তাদের ছেলেপুলেই হয়ত পুলের তলায় পোঁতা যাবে।

কারও মনে শান্তি নেই, সব বাড়িতেই কেমন একটা ছমছম ভাব। আবার তার উপরে আছে খবরের কাগজের খবর। কলকাতায় যারা চাকরি করে তারা এসে জানায়, সেদিন বউবাজারে একটা ছেলেধরা ধরা পড়েচে, কাল কড়েয়ায় আর একটা লোককে হাতে-নাতে ধরা গেছে, সে ছেলে ধরে ঝুলিতে পুরছিল। এমনি কত খবর! কলকাতার অলিতে গলিতে সন্দেহক্রমে কত নিরীহের প্রতি কত অত্যাচারের খবর লোকের মুখে মুখে আমাদের দেশে এসে পৌঁছুল। এমনি যখন অবস্থা তখন আমাদের দেশেও হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটে গেল। সেইটে বলি।

পথের অদূরে একটা বাগানের মধ্যে বাস করেন বৃদ্ধ মুখুজ্যে-দম্পতি। ছেলেপুলে নেই, কিন্তু সংসারে ও সাংসারিক সকল ব্যাপারে আসক্তি আঠারো আনা। ভাইপোকে আলাদা করে দিয়েছেন, কিন্তু আর কিছুই দেননি। দেবেন এ-কল্পনাও তাঁদের নেই। সে এসে মাঝে মাঝে দাবী করে ঘটি-বাটি-তৈজসপত্র; খুড়ী চেঁচিয়ে হাট বাঁধিয়ে দিয়ে লোকজন জড়ো করেন, বলেন হীরু আমাদের মারতে এসেছিল। হীরু বলে, সেই ভাল—মেরেই একদিন সমস্ত আদায় করবো।

এমনি করে দিন যায়।

সেদিন সকালে ঝগড়ার চূড়ান্ত হয়ে গেল। হীরু উঠানে দাঁড়িয়ে বললে, শেষ বেলা বলচি খুড়ো, আমার ন্যায্য পাওনা দেবে কিনা বল?

খুড়ো বললেন, তোর কিছুই নেই।

নেই?

না।

আদায় করে আমি ছাড়ব।

খুড়ী রান্নাঘরে কাজে ছিলেন, বেরিয়ে এসে বললেন, তা হলে যা তোর বাবাকে ডেকে আন্‌ গে।

হীরু বললে, আমার বাবা স্বর্গে গেছেন, তিনি আসতে পারবেন না,—আমি গিয়ে তোমাদের বাবাদের ডেকে আনব। তাদের কেউ হয়তো বেঁচে আছে—তারা এসে চুলচিরে আমার বখ্‌রা ভাগ করে দেবে।

তারপর মিনিট-দুয়েক ধরে উভয়ে পক্ষে যে-ভাষা চলল তা লেখা চলে না।

যাবার আগে হীরু বলে গেল, আজই এর একটা হেস্তনেস্ত করে তবে ছাড়ব। এই তোমাদের বলে গেলুম। সাবধান!

রান্নাঘর থেকে খুড়ী বললেন, তোর ভারী ক্ষমতা! যা পারিস কর গে।

হীরু এসে হাজির হলো রাইপুরে। ঘর-কয়েক গরীব মুসলমানদের পল্লী। মহরমের দিনে বড় বড় লাঠি ঘুরিয়া তারা তাজিয়া বার করে। লাঠি তেলে পাকানো, গাঁটে গাঁটে পেতল বাঁধানো। এই থেকে অনেকের ধারণা তাদের মত লাঠি-খেলোয়াড় এ অঞ্চলে মেলে না। তারা পারে না এমন কাজ নেই। শুধু পুলিশের ভয়ে শান্ত হয়ে থাকে।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিশেষ সংবাদ

মাথাপিছু জাতীয় আয় বৃদ্ধির জন্য উৎপাদনও বাড়াতে হবে

0
দেশে মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে ৩৫ ডলার। চলতি অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে এ আয় দুই হাজার ৭৮৪ ডলার। ২০২২–২৩ অর্থবছরে মাথাপিছু আয় ছিল দুই হাজার...

৩০ উপজেলায় চক্ষু চিকিৎসা কমিউনিটি বেইজড করা হচ্ছে

0
টুঙ্গিপাড়া (গোপালগঞ্জ). ২২ মে, ২০২৪ (বাসস): গোপালগঞ্জসহ ৯ জেলার ৩০ উপজেলায় চক্ষু চিকিৎসা সেবা কমিউনিটি বেইজড করা হচ্ছে।কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে চোখের সাধারণ সমস্যাগুলোর সেবা...

আগের চেয়ে সুস্থ শাহরুখ, থাকবেন আইপিএল ফাইনালে

0
শাহরুখ ভক্তদের দুশ্চিন্তা কমালেন জুহি চাওলা। জানালেন আগের চেয়ে ভালো আছেন অভিনেতা। থাকবেন কলকাতা নাইট রাইডার্সের ম্যাচেও। ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ এইটিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কেকেআরের...

ফিচারবহুল ওয়্যারলেস মাউস উন্মোচন হুয়াওয়ের

0
নিজস্ব প্রতিবেদক : চীনের বাজারে বিভিন্ন ফিচারসহ ওয়্যারলেস প্রযুক্তির দুটি মাউস উন্মোচন করেছে হুয়াওয়ে। সম্প্রতি দ্বিতীয় প্রজন্মের তারবিহীন মাউস ও নিয়ারলিংক সুবিধা সংবলিত স্টারলাইট...

শেষ সময়ে বিশ্বকাপ দলে পরিবর্তন আনল নেদারল্যান্ডস

0
নেদারল্যান্ডস ক্রিকেট দল। ছবি: সংগৃহীত নিজস্ব প্রতিবেদক : টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে দলে দুইটি পরিবর্তন এনেছে নেদারল্যান্ডস। ফ্রেড ক্লাসেন ও ড্যানিয়েল ডোরাম ইনজুরিতে ছিটকে...