28.7 C
Dhaka
বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬

চোখে জল আনা বার্তায়, পর্তুগালকে বিদায় জানালেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

পর্তুগাল জাতীয় দলের জার্সি ও অধিনায়কের আর্মব্যান্ডকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টানার সিদ্ধান্ত জানিয়ে পর্তুগিজ জনগণের উদ্দেশে আবেগঘন একটি চিঠি প্রকাশ করেছেন দেশটির ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার। ২০০৩ সালের আগস্টে জাতীয় দলের হয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন তিনি। এরপর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করেছেন পাঁচবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই তারকা। নিজের বিদায়বার্তায় রোনালদো জানিয়েছেন, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে কাটানো সময় তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পর্তুগালের হয়ে খেলতে পারাকে তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে নিজের জন্য বিশেষ সম্মান ও গর্বের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

রোনালদোর বিদায়ের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ আন্তর্জাতিক পথচলার অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার ভাবনা। নিজের চিঠিতে তিনি বলেছেন, জাতীয় দলের জার্সি ও অধিনায়কের আর্মব্যান্ড কখনোই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না; বরং এটি পুরো পর্তুগিজ জাতির প্রতিনিধিত্ব করে। ২৩ বছর ধরে সেই দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পাওয়াকে নিজের জন্য বিশেষ সৌভাগ্য বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর মতে, সময় এসেছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে সেই দায়িত্ব তুলে দেওয়ার। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না বলেও জানিয়েছেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। কারণ, এই সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে নেওয়া হয়নি, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তাঁর আবেগ ও হৃদয়ের অনুভূতি। জাতীয় দলের হয়ে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর জীবনে বিশেষ স্মৃতি হয়ে থাকবে।

২০০৩ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেকের পর থেকে রোনালদোর জীবন বদলে যেতে শুরু করে। জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য ম্যাচ, গোল, রেকর্ড এবং শিরোপা জয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। তবে বিদায়বার্তায় শুধু ব্যক্তিগত অর্জন কিংবা পরিসংখ্যানের কথা তুলে ধরেননি এই তারকা। বরং সমর্থকদের ভালোবাসা, প্রবাসী পর্তুগিজদের আবেগ এবং দেশের মানুষের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার সময় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে থাকা পর্তুগিজ মানুষদের অনুভূতি উপলব্ধি করতেন। অনেক সমর্থক তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে কখনো দেখেননি, কিন্তু তাঁদের ভালোবাসা সবসময় অনুভব করেছেন। তাঁর কাছে ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়, বরং মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং একে অপরের সঙ্গে সংযোগ তৈরির অন্যতম মাধ্যম।

পর্তুগালের হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও রয়েছে রোনালদোর। কিছু ম্যাচে দুর্দান্ত জয় পেয়েছেন, আবার কিছু পরাজয় তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে। নিজের ভুল এবং ব্যর্থতার কথাও অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। জানিয়েছেন, অনেক সময় পর্তুগিজ সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেও কখনো হাল ছাড়েননি। প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং দেশের জন্য আরও বেশি অর্জনের স্বপ্ন দেখেছেন। তাঁর মতে, গোল একসময় ভুলে যাওয়া যায়, ট্রফি জাদুঘরে জায়গা পায় এবং রেকর্ড একদিন ভেঙে যায়। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে অর্জন করা ভালোবাসা কখনো মুছে যায় না। নিজের কোনো গোল যদি একজন সমর্থককে আনন্দিত করে থাকে, কিংবা দেশের জন্য গর্ব অনুভব করিয়ে থাকে, তাহলে তাঁর কাছে সেটিই বড় সার্থকতা।

জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রোনালদো। দীর্ঘ পথচলায় একসঙ্গে অনুশীলন, মাঠের লড়াই, জয় উদ্‌যাপন এবং পরাজয়ের কষ্ট ভাগাভাগি করার স্মৃতি তুলে ধরেছেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও কখনো নিজেকে এককভাবে দলের সাফল্যের দাবিদার মনে করেননি। তাঁর ভাষায়, কোনো অধিনায়ক একা পথ চলতে পারেন না। দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ই তাঁর গল্পের অংশ। সতীর্থদের সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, মাঠে নামার আগে নীরব অপেক্ষা, একে অপরকে জড়িয়ে ধরা এবং কঠিন সময় পার করার অভিজ্ঞতা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে জাতীয় দলের কোচ, পরিচালক, চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্ট, কিট ম্যানেজার এবং পর্দার আড়ালে কাজ করা প্রত্যেক সদস্যের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। তাঁদের অবদান ছাড়া কোনো অর্জনই সম্ভব হতো না বলে উল্লেখ করেছেন পর্তুগিজ মহাতারকা।

পরিবারের প্রতিও আবেগঘন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন রোনালদো। জাতীয় দলের দায়িত্ব পালনের কারণে দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়েছে তাঁকে। বিভিন্ন সময়ে পারিবারিক মুহূর্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে দেশের হয়ে খেলার জন্য। এসব ত্যাগ এবং অনুপস্থিতি বুঝে নেওয়ার জন্য পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এতদূর আসার পেছনে পরিবারের সহযোগিতা ও ভালোবাসা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পর্তুগালের সাধারণ মানুষের উদ্দেশে জানিয়েছেন বিশেষ বার্তা। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় গ্যালারিতে থাকা শিশু, মা-বাবা, দাদা-দাদি এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা সমর্থকদের মুখ তাঁর মনে সবসময় ভেসে উঠবে। সেই মুহূর্তে মানুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ক্লাব, রং, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান ভুলে সবাই এক হয়ে যায়। সবার পরিচয় হয়ে ওঠে একটাই—পর্তুগিজ।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন রোনালদো। তিনি মনে করেন, একটি দেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন নতুন স্বপ্ন দেখা তরুণ এবং কখনো হাল না ছাড়া ফুটবলার। পর্তুগাল যেন নতুন নতুন প্রতিভা তৈরি করে এবং ভবিষ্যতেও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে, সেই প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি। নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ মুহূর্তে মাথা উঁচু করে বিদায় নেওয়ার কথা বলেছেন এই তারকা। তবে জাতীয় দলের মাঠের যাত্রা শেষ হলেও পর্তুগালের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। ভবিষ্যতেও দলের প্রতিটি জয়, পরাজয় এবং আনন্দের মুহূর্তে সমর্থক হিসেবে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। মাদেইরার ছোট্ট ছেলে থেকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার দীর্ঘ যাত্রায় পর্তুগালের প্রতিনিধিত্ব করাকেই নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন রোনালদো। তাঁর বিদায়বার্তার শেষ কথাগুলোতেও ফুটে উঠেছে দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ৭ নম্বর জার্সি অন্য কারও গায়ে উঠলেও সেই জার্সি পরার গর্ব আজীবন নিজের কাছে রাখবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিশেষ সংবাদ

সৌদির সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ৬ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা দাবি হুথিদের

0
সৌদি আরবের সঙ্গে চলমান সংঘাত বন্ধে ৫১ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথি বিদ্রোহীরা।...

শিশুর প্রকৃত শিখন নিশ্চিতে নতুন পরিকল্পনা, প্রাথমিক শিক্ষায় যেসব পরিবর্তন আনছে সরকার

0
প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে কী শিখছে, তার মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি...

ঢাকায় ই-রিকশা চলবে চার জোনে, নির্ধারণ হবে সংখ্যা

0
রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত ই-রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকাকে চারটি জোনে ভাগ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জোনে কতটি ই-রিকশা চলাচল করতে...

ঢাকা-পাবনা রুটে নতুন ট্রেন চালু ১৯ নভেম্বর, সময়সূচি প্রকাশ

0
ঢাকা-পাবনা রুটে আগামী ১৯ নভেম্বর থেকে নতুন এক জোড়া আন্তনগর ট্রেন চালু হচ্ছে। নতুন ট্রেন দুটির নাম ‘পাবনা প্রভাতী এক্সপ্রেস’ ও ‘পাবনা গোধূলি এক্সপ্রেস’।...

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ৭২ নম্বরের এমসিকিউ, কোন বিষয়ে কত নম্বর?

0
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ভর্তি পরীক্ষায় ৭২ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষা নেওয়া হবে। পরীক্ষার সময় এক ঘণ্টা। প্রতিটি প্রশ্নের মান শূন্য দশমিক ৭৫ নম্বর এবং প্রতিটি...