28.3 C
Dhaka
রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০২৬

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত দেবেন যেভাবে

নিজে নিয়মিত নামাজ আদায় করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা একজন মুমিনের দায়িত্ব। বিশেষ করে মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত দেওয়া সন্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল। কারণ ইসলামে মা-বাবার মর্যাদা অনেক উঁচুতে। তাঁদের কোনো ভুল সংশোধন করতে কিংবা ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতে গিয়ে এমন কোনো আচরণ করা যাবে না, যাতে তাঁদের মনে কষ্ট লাগে বা তাঁরা অসম্মানিত বোধ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধৈর্য, ভালোবাসা, সুন্দর আচরণ এবং প্রজ্ঞার সঙ্গে কথা বলা।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং তার ওপর অবিচল থাকো।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১৩২)। এই নির্দেশনা থেকে বোঝা যায়, পরিবারের সদস্যদের নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা মুসলিম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে মা-বাবাকে নামাজের কথা বলার সময় সন্তানের ভাষা ও আচরণ হতে হবে অত্যন্ত নম্র ও সম্মানজনক। তাঁদের ওপর কর্তৃত্ব দেখানো, ধমক দেওয়া কিংবা নিজেকে তাঁদের চেয়ে বেশি জ্ঞানী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই নিজের ভাষা ও সম্বোধনের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। কোনো বিষয়ে তাঁদের ভুল মনে হলেও রূঢ় ভাষায় কথা বলা যাবে না। পবিত্র কোরআনে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩)। অর্থাৎ তাঁদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে বিনয়, কোমলতা ও শ্রদ্ধা বজায় রাখা সন্তানের দায়িত্ব।

নবী ইব্রাহিম (আ.) তাঁর পিতা আজরকে আল্লাহর পথে আহ্বান করার সময় বারবার ‘হে আমার প্রিয় পিতা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তাঁর এই কথোপকথন সুরা মারইয়ামের ৪২ থেকে ৪৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এখান থেকে মা-বাবাকে ধর্মীয় বিষয়ে বোঝানোর ক্ষেত্রে কোমল ভাষা ও আন্তরিকতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। তাঁরা কোনো কথা শুনতে না চাইলে কিংবা বিরক্তি প্রকাশ করলেও সন্তানের উচিত ধৈর্য ধরে সম্মান বজায় রাখা।

শুধু মুখে নামাজের কথা বলার চেয়ে নিজের কাজ ও চরিত্রের মাধ্যমে মা-বাবাকে প্রভাবিত করাও কার্যকর উপায় হতে পারে। সন্তান যখন নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, সত্য কথা বলে, মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে এবং মা-বাবার সেবায় আরও যত্নবান হয়, তখন তাঁর আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন পরিবারের অন্য সদস্যদেরও আকৃষ্ট করতে পারে। নামাজের প্রভাবে একজন মানুষের জীবনে যে শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার চর্চা তৈরি হয়, তা নিজের আচরণে ফুটিয়ে তোলাই হতে পারে নীরব দাওয়াতের সুন্দর উদাহরণ।

মা-বাবাকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করতে ঘরেও ধর্মীয় পরিবেশ গড়ে তোলা যেতে পারে। আজান হলে মনোযোগ দিয়ে শোনা, আজানের জবাব দেওয়া, নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করা এবং পরিবারের সদস্যদের সামনে সময়মতো নামাজ আদায় করার মতো অভ্যাস তাঁদের মনে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে পারে। সরাসরি উপদেশ দেওয়ার পরিবর্তে কখনো কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা বলে তাঁদের সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। যেমন, সন্তান মাকে বলতে পারে, ‘মা, ফজরের সময় আমাকে একটু ডেকে দিয়ো।’ এ ধরনের আন্তরিক কথাবার্তা পরিবারের মধ্যে নামাজ নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের জন্য নিয়মিত দোয়া করাও জরুরি। কারণ মানুষের অন্তর পরিবর্তন করা এবং কাউকে সঠিক পথে পরিচালিত করার তাওফিক একমাত্র আল্লাহই দেন। সন্তান সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও মা-বাবা কখন নামাজের প্রতি আগ্রহী হবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তাই নিজের প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তাঁদের হেদায়াত ও ইবাদতে অবিচল থাকার জন্য প্রার্থনা করা উচিত।

পবিত্র কোরআনে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর একটি দোয়া উল্লেখ করা হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’ (সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৪০)। এই দোয়ার মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের সদস্যদের নামাজি হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনার শিক্ষা পাওয়া যায়। সন্তানও এই দোয়া পড়তে পারে এবং মা-বাবার জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একবার বা দুবার নামাজের কথা বলার পর তাঁরা আগ্রহ না দেখালে হতাশ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। আবার তাঁরা বিরক্ত হলে বা বকাঝকা করলে পাল্টা তর্কে জড়ানোও ঠিক হবে না। ইসলামে মা-বাবার সঙ্গে সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে শিরক করার নির্দেশ দিলেও সেই নির্দেশ মানা যাবে না, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে দুনিয়াতে সদ্ভাবে বসবাস করতে হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মা-বাবাকে নামাজের দাওয়াত দেওয়া কোনো এক দিনের কাজ নয়; এটি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ধৈর্যের সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। তাঁদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, অপমান করা কিংবা অন্যের সঙ্গে তুলনা করার পরিবর্তে নিজের সুন্দর আচরণ, নিয়মিত ইবাদত, আন্তরিক কথা ও নিরবচ্ছিন্ন সেবার মাধ্যমে তাঁদের উৎসাহিত করা উচিত। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে, যেন তিনি মা-বাবাকে নামাজের প্রতি আগ্রহী করেন এবং তাঁদের ইবাদতে অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন।

Related Articles

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

বিশেষ সংবাদ

পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ, ঢাকাজুড়ে আতঙ্ক

0
পল্লবী থানার ভেতরে ককটেল বিস্ফোরণ, রাজধানীতে একের পর এক নাশকতার ঘটনা রাজধানী ঢাকায় একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি...

ভুটান-শ্রীলঙ্কার ড্রয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত বাংলাদেশের

0
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ‘এ’ গ্রুপে ভুটান ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার ম্যাচ ২-২ গোলে ড্র হওয়ায় সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের পর গ্রুপ থেকে দ্বিতীয় দল হিসেবে...

ফেসবুক ব্যবহারে বিশ্বে শীর্ষে ফিলিস্তিন, বাংলাদেশের অবস্থান কত?

0
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে ফেসবুক ব্যবহারের হারে শীর্ষে রয়েছে ফিলিস্তিন। দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৮৮ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, ৪২ শতাংশ...

দেবিদ্বারে বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশ, গাড়ি ভাঙচুর

0
কুমিল্লার দেবিদ্বারে বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমাবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরার...

এক ছেলেকে কবর দিয়ে ফিরেই ছোট ছেলের লাইফ সাপোর্টের সামনে বাবা

0
দুই ছেলের অসুস্থতায় বিপর্যস্ত পরিবার, বড় ছেলের মৃত্যুতে শোকের মাতম; আইসিইউতে ছোট ভাই এক রাত আগেও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছিল ১০ বছরের নুর মোহাম্মদ আরাফাতের।...