শীত এলেই অনেকের মধ্যে সর্দি, কাশি, হাঁচি, নাক বন্ধ ও গলাব্যথার সমস্যা বেড়ে যায়। কারও কয়েক দিন পরপর সর্দি লাগে, আবার কারও ক্ষেত্রে একবার সর্দি-কাশি শুরু হলে সহজে কমতে চায় না। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক দুর্বল, তাঁদের মধ্যে এসব সমস্যা বেশি দেখা যেতে পারে। এ কারণে শীতকালে সর্দি-কাশি কেন বাড়ে, ঘন ঘন সর্দি লাগা কোনো রোগের লক্ষণ কি না এবং ঘরে বসে কীভাবে উপসর্গ কমানো যায়, তা জানা জরুরি।
সাধারণত শীতের সময় ঠান্ডাজনিত সংক্রমণ বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। তাপমাত্রা কমে যাওয়া, বাতাসের আর্দ্রতার পরিবর্তন, ঘরের ভেতরে বেশি সময় থাকা এবং মানুষের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়। তবে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়ায় থাকলেই সর্দি হয় না। সাধারণ সর্দি মূলত ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে।
সঠিক পরিচর্যা, পরিচ্ছন্নতা, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার এবং কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে সর্দি-কাশির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কোন লক্ষণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও জানা গুরুত্বপূর্ণ।
শীতকালে সর্দি-কাশি বেশি হয় কেন?
শীতকালে সর্দি-কাশি বাড়ার অন্যতম কারণ হলো এ সময় বিভিন্ন ধরনের শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাস বেশি সক্রিয়ভাবে ছড়াতে পারে। সাধারণ সর্দির জন্য রাইনোভাইরাসসহ বিভিন্ন ভাইরাস দায়ী। অন্যদিকে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু, রেসপিরেটরি সিনসাইটিয়াল ভাইরাস (RSV) এবং করোনাভাইরাসও শীতের সময় শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতার কারণ হতে পারে।
শীতকালে সর্দি-কাশি বাড়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।
১. ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসের প্রভাব
শীতের বাতাসে আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। শুষ্ক বাতাসের কারণে নাক ও শ্বাসনালির ভেতরের আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হয়। ফলে নাকের ভেতরের স্বাভাবিক সুরক্ষাব্যবস্থা কিছুটা দুর্বল হতে পারে।
আমাদের নাক ও শ্বাসনালিতে মিউকাস বা শ্লেষ্মা থাকে, যা ধুলাবালি, জীবাণু ও অন্যান্য ক্ষতিকর কণা আটকে রাখতে সাহায্য করে। এই শ্লেষ্মা এবং সূক্ষ্ম সিলিয়ার সম্মিলিত কাজ শ্বাসতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখে। শুষ্ক পরিবেশে এ ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রভাবিত হতে পারে।
২. ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানো
শীতকালে বাইরে ঠান্ডা থাকার কারণে মানুষ ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটান। অনেক সময় জানালা-দরজা বন্ধ রাখা হয়। ফলে একই ঘরে একাধিক ব্যক্তি থাকলে একজনের শরীর থেকে ছড়ানো ভাইরাস অন্যদের সংক্রমিত করার সুযোগ পায়।
বিশেষ করে অফিস, স্কুল, গণপরিবহন, বাজার ও জনাকীর্ণ স্থানে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৩. ভাইরাসের সংক্রমণ সহজে ছড়িয়ে পড়া
সর্দি-কাশির ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও কথা বলার সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে অন্যের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিস স্পর্শ করে পরে অপরিষ্কার হাতে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করলেও সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে।
৪. শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় প্রভাব
অতিরিক্ত ঠান্ডা ও শুষ্ক পরিবেশ নাকের ভেতরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। পাশাপাশি শীতকালে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস শরীরের সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. মৌসুমি ফ্লু ও অন্যান্য ভাইরাসের প্রকোপ
শীতকালে শুধু সাধারণ সর্দি নয়, ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের ভাইরাসের সংক্রমণও বাড়তে পারে। এসব ভাইরাসের কারণে সর্দি, কাশি, জ্বর, মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা যায়।
তবে সাধারণ সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা এক নয়। ফ্লুতে অনেক সময় হঠাৎ বেশি জ্বর, শরীর ব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দেয়।
ঘন ঘন সর্দি লাগা কিসের লক্ষণ?
অনেকেই অভিযোগ করেন, তাঁদের একটু ঠান্ডা লাগলেই সর্দি শুরু হয়। কারও মাসে একাধিকবার সর্দি হয়, আবার কারও নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি ও নাক বন্ধ থাকার সমস্যা দীর্ঘদিন থাকে।
ঘন ঘন সর্দি লাগার অর্থ সব সময় রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া নয়। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
১. অ্যালার্জিক রাইনাইটিস
ঘন ঘন হাঁচি, নাক দিয়ে স্বচ্ছ পানি পড়া, নাক চুলকানো এবং চোখ দিয়ে পানি পড়ার অন্যতম কারণ অ্যালার্জিক রাইনাইটিস।
ধুলাবালি, ফুলের পরাগ, ঘরের ধুলার মাইট, পশুর লোম কিংবা ছত্রাকের সংস্পর্শে এ সমস্যা বাড়তে পারে। শীতকালে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখা এবং ধুলাবালি জমে থাকার কারণে কারও কারও অ্যালার্জির উপসর্গ বেড়ে যায়।
অ্যালার্জিক রাইনাইটিসকে অনেক সময় সাধারণ সর্দি মনে করা হয়। কিন্তু এটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ নয়।
২. সাইনাসের সমস্যা
সাইনাস হলো নাকের চারপাশের হাড়ের ভেতরে থাকা বায়ুভর্তি কিছু গহ্বর। এসব স্থানে প্রদাহ বা সংক্রমণ হলে নাক বন্ধ, মাথাব্যথা, মুখে চাপ অনুভব এবং নাক দিয়ে শ্লেষ্মা পড়ার সমস্যা হতে পারে।
সাইনাসের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বারবার সর্দি হয়েছে বলে মনে হতে পারে। বিশেষ করে কপাল, চোখের চারপাশ ও গালের হাড়ের কাছে ব্যথা থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. হাঁপানি বা অ্যাজমা
হাঁপানির রোগীদের ঠান্ডা বাতাসে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ এবং শ্বাস নেওয়ার সময় শোঁ শোঁ শব্দ হতে পারে।
অনেকেই এসব উপসর্গকে সাধারণ ঠান্ডাজনিত কাশি মনে করেন। কিন্তু বারবার রাতে কাশি হওয়া, ব্যায়ামের পর কাশি বাড়া কিংবা ঠান্ডা বাতাসে শ্বাসকষ্ট হলে হাঁপানির সম্ভাবনা যাচাই করা প্রয়োজন।
৪. বারবার ভাইরাসের সংক্রমণ
বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে বছরে একাধিকবার সর্দি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্কুল, খেলাধুলার জায়গা কিংবা অন্যান্য শিশুদের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ভাইরাসের সংস্পর্শে আসে।
প্রতিবার ভিন্ন ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আবার সর্দি হতে পারে। তাই ঘন ঘন সর্দি হলেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
৫. রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়া
কিছু ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল থাকলে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। অপুষ্টি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, নির্দিষ্ট কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ কিংবা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে এমন চিকিৎসার কারণে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বারবার গুরুতর সংক্রমণ, দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকা, অস্বাভাবিকভাবে সংক্রমণ হওয়া বা চিকিৎসায় সহজে সুস্থ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সর্দি-কাশি কমানোর ঘরোয়া উপায়
সাধারণ ভাইরাসজনিত সর্দি-কাশির নির্দিষ্ট কোনো তাৎক্ষণিক নিরাময় নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিজেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে এবং ধীরে ধীরে উপসর্গ কমে আসে।
তবে কিছু নিরাপদ ঘরোয়া উপায় সর্দি-কাশির অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
১. পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার পান করুন
সর্দি-কাশির সময় শরীরে পানির ঘাটতি হতে দেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় থাকে এবং গলার শুষ্কতা কমতে পারে।
পানির পাশাপাশি হালকা গরম স্যুপ, ডাল, উষ্ণ পানীয় ও অন্যান্য তরল খাবার খাওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে জ্বর থাকলে বা ঘাম বেশি হলে শরীরে পানির চাহিদা বাড়তে পারে।
২. মধু খেতে পারেন
কাশির অস্বস্তি কমাতে মধু উপকারী হতে পারে। বিশেষ করে রাতে কাশি বেশি হলে এক চামচ মধু গলার অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
প্রয়োজনে এক কাপ কুসুম গরম পানিতে মধু মিশিয়ে পান করা যায়।
তবে এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনো অবস্থাতেই মধু দেওয়া যাবে না। এতে শিশুর বটুলিজম নামের গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি থাকে।
৩. লবণপানিতে গার্গল করুন
গলাব্যথা বা গলার অস্বস্তি থাকলে কুসুম গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে গার্গল করা যেতে পারে।
এক গ্লাস কুসুম গরম পানিতে প্রায় আধা চা-চামচ লবণ মিশিয়ে গার্গল করলে সাময়িক আরাম পাওয়া যেতে পারে।
তবে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এটি উপযুক্ত নয়, কারণ তারা গার্গলের পানি গিলে ফেলতে পারে।
৪. নাক বন্ধ থাকলে স্যালাইন ব্যবহার করুন
সর্দির কারণে নাক বন্ধ হয়ে গেলে নরমাল স্যালাইন নাকের স্প্রে বা ড্রপ ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা পাতলা করতে এবং জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
স্যালাইন ব্যবহারের আগে পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। নাক ধোয়ার জন্য আলাদা যন্ত্র ব্যবহার করলে নিরাপদ, জীবাণুমুক্ত, পাতিত অথবা ফুটিয়ে ঠান্ডা করা পানি ব্যবহার করা জরুরি।
৫. পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
সর্দি-কাশির সময় শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে কাজ করতে সাহায্য করে।
অসুস্থ অবস্থায় অতিরিক্ত পরিশ্রম, রাত জাগা এবং পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন।
৬. উষ্ণ পানীয় পান করুন
কুসুম গরম পানি, স্যুপ বা লেবু-মধু মেশানো উষ্ণ পানীয় গলার অস্বস্তি কমাতে পারে।
তবে অতিরিক্ত গরম পানীয় পান করবেন না। এতে মুখ ও গলার ভেতরের নরম টিস্যু পুড়ে যেতে পারে।
৭. ধোঁয়া ও ধুলাবালি এড়িয়ে চলুন
সিগারেটের ধোঁয়া, রান্নার ধোঁয়া, ধুলাবালি ও তীব্র গন্ধ কাশি বাড়াতে পারে। সর্দি-কাশির সময় এসব পরিবেশ এড়িয়ে চলুন।
ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
সর্দি হলে করণীয় কী?
সর্দি শুরু হলে প্রথম থেকেই কিছু নিয়ম মেনে চললে অস্বস্তি কমানো এবং অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
করণীয়
কেন করবেন
পর্যাপ্ত বিশ্রাম
শরীরের স্বাভাবিক পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে
পানি পান
পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করে
নাকের স্যালাইন ব্যবহার
নাকের বন্ধভাব কমাতে সাহায্য করে
মাস্ক ব্যবহার
অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়ানোর ঝুঁকি কমায়
হাত ধোয়া
হাতের মাধ্যমে জীবাণু ছড়ানো কমায়
কুসুম গরম পানীয়
গলার অস্বস্তি কমাতে পারে
ধুলাবালি এড়িয়ে চলা
নাক ও গলার জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করে
সর্দি হলে সম্ভব হলে বাড়িতে বিশ্রাম নিন। বিশেষ করে জ্বর থাকলে বা অসুস্থ বোধ করলে অন্যদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।
কাশি বা হাঁচির সময় টিস্যু ব্যবহার করুন। টিস্যু না থাকলে কনুইয়ের ভাঁজে মুখ ঢেকে কাশি বা হাঁচি দিন। ব্যবহৃত টিস্যু নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে হাত পরিষ্কার করুন।
শীতকালে সর্দি-কাশি প্রতিরোধের উপায়
সর্দি-কাশি হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া ভালো। বিশেষ করে শীতকালে কিছু অভ্যাস নিয়মিত মেনে চললে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
১. নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন
বাইরে থেকে বাসায় ফিরে, খাবার খাওয়ার আগে, নাক পরিষ্কার করার পর এবং অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিন।
কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
২. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন
প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. পুষ্টিকর খাবার খান
শীতকালে খাবারের তালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, মাছ, ডিম, দুধ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন।
ভিটামিন সি, ভিটামিন ডি, জিঙ্ক ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু কোনো একটি খাবার বা ভিটামিন খেলেই সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করা যায় না।
৪. ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন
শীতের সময় ঘরের দরজা-জানালা সব সময় বন্ধ না রেখে আবহাওয়া ও পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু সময়ের জন্য খুলে দিন।
ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করলে বাতাসে জমে থাকা ভাইরাসের কণার ঘনত্ব কমতে পারে। বিশেষ করে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকলে বায়ু চলাচলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
৫. প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহার করুন
হাসপাতাল, গণপরিবহন, বাজার কিংবা জনাকীর্ণ স্থানে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকলে মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন।
নিজের সর্দি-কাশি থাকলেও অন্যদের সুরক্ষার জন্য মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
৬. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন
হাঁটাহাঁটি, হালকা ব্যায়াম ও নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
তবে জ্বর বা তীব্র অসুস্থতা থাকলে ব্যায়াম না করে বিশ্রাম নিন।
৭. ফ্লুর টিকা নেওয়ার বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি এবং গুরুতর অসুস্থতার সম্ভাবনা কমাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য টিকার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মনে রাখতে হবে, ফ্লুর টিকা সাধারণ সর্দি সৃষ্টিকারী সব ধরনের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেয় না।
সর্দি-কাশি হলে কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন?
সর্দি-কাশি হলে অনেকেই দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় নিজের ইচ্ছামতো ওষুধ খেয়ে থাকেন। এতে উপকারের পরিবর্তে ক্ষতি হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না: সাধারণ সর্দি-কাশি ভাইরাসের কারণে হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করে না। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক খেলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অতিরিক্ত গরম পানির ভাপ নেবেন না: গরম পানির পাত্রে মুখ রেখে ভাপ নেওয়ার সময় অসাবধানতায় শরীর পুড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এ ধরনের পদ্ধতি বিপজ্জনক। নাক বন্ধ থাকলে স্যালাইন বা নিরাপদভাবে গরম শাওয়ারের বাষ্পযুক্ত পরিবেশে কিছুক্ষণ থাকা যেতে পারে।
নিজে থেকে একাধিক ঠান্ডার ওষুধ খাবেন না: বিভিন্ন সর্দি-কাশির ওষুধে একই ধরনের উপাদান থাকতে পারে। একাধিক ওষুধ একসঙ্গে খেলে নির্ধারিত মাত্রার বেশি ওষুধ শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ধূমপান করবেন না: ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান কাশি বাড়াতে এবং শ্বাসতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
শিশুদের নিজের ইচ্ছায় কাশির ওষুধ দেবেন না: বিশেষ করে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুকে সাধারণ সর্দি-কাশির ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কখন সর্দি-কাশি হলে চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
সাধারণ সর্দি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যে কমতে শুরু করে। তবে কাশি আরও কিছুদিন থাকতে পারে। কিছু উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
যেমন:
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা দ্রুত শ্বাস চললে।
বুকে ব্যথা বা চাপ অনুভূত হলে।
জ্বর চার দিনের বেশি স্থায়ী হলে।
১০ দিন পার হলেও সর্দি-কাশির উন্নতি না হলে।
উপসর্গ কমে যাওয়ার পর আবার জ্বর বা কাশি বেড়ে গেলে।
শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে।
কাশি তিন সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে।
হাঁপানি, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে উপসর্গ বাড়লে।
শিশুদের ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, বুকের খাঁচা ভেতরের দিকে দেবে যাওয়া, খেতে না পারা, অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া কিংবা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
বিশেষ করে তিন মাসের কম বয়সী শিশুর শরীরের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
সাধারণ সর্দি ও ফ্লুর মধ্যে পার্থক্য কী?
সাধারণ সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু—দুটিই ভাইরাসজনিত শ্বাসতন্ত্রের অসুস্থতা। তবে উপসর্গের তীব্রতা ও শুরু হওয়ার ধরনে পার্থক্য থাকতে পারে।
উপসর্গ
সাধারণ সর্দি
ইনফ্লুয়েঞ্জা বা ফ্লু
শুরু
ধীরে ধীরে
অনেক সময় হঠাৎ
হাঁচি
বেশি হতে পারে
তুলনামূলক কম
নাক দিয়ে পানি পড়া
সাধারণ
হতে পারে
জ্বর
অনেক সময় থাকে না বা কম থাকে
প্রায়ই বেশি থাকে
শরীর ব্যথা
সাধারণত হালকা
বেশি হতে পারে
ক্লান্তি
সাধারণত কম
অনেক সময় বেশি
কাশি
মৃদু থেকে মাঝারি
তীব্র হতে পারে
এগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য, নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের উপায় নয়। ফ্লু, কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের উপসর্গের মধ্যে মিল থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানো উচিত।
শেষ কথা
শীতকালে সর্দি-কাশি বেড়ে যাওয়ার পেছনে ঠান্ডা আবহাওয়া, শুষ্ক বাতাস, ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানো এবং বিভিন্ন ভাইরাসের সংক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ঘন ঘন সর্দি লাগলেই রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল—এমন ধারণা ঠিক নয়। অ্যালার্জি, সাইনাসের সমস্যা কিংবা হাঁপানির কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তাই শীতকালে সুস্থ থাকতে নিয়মিত হাত ধোয়া, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, পানি পান এবং ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করুন। সর্দি-কাশি শুরু হলে বিশ্রাম নিন এবং নিরাপদ ঘরোয়া পদ্ধতিতে উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করুন।
তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ও দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাসই শীতকালে সর্দি-কাশির ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।













